বাকশাল ও ১৫ই আগস্ট: ইতিহাসের দর্পণ ও অপপ্রচারের সত্যতা
প্রতিবেদক: মোঃ এশারুল, পাবনা জেলা প্রতিনিধি।
বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘বাকশাল’ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) গঠনকে প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা একটি দীর্ঘস্থায়ী অপপ্রচার। ঐতিহাসিক দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাকশাল ছিল একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের কর্মসূচি, আর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল গভীর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
১. বাকশাল কি কেবল একদলীয় শাসন ছিল?
দলিল অনুযায়ী, বাকশাল ছিল ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত একটি জাতীয় সংগঠন। এর মূল লক্ষ্য ছিল:
দুর্নীতি দমন: প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
উৎপাদন বৃদ্ধি: শিল্প ও কৃষিখাতে উৎপাদন বাড়ানো।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: জেলা গভর্নর নিয়োগের মাধ্যমে তৃণমূলে ক্ষমতা পৌঁছে দেওয়া।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত), ২১ জুন ১৯৭৫। এই গেজেট অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তালিকায় বিভিন্ন পেশাজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্থান দেওয়া হয়েছিল। এটি কোনো স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য একটি বিশেষকালীন ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কর্মসূচি।
২. হত্যাকাণ্ডের আসল প্রেক্ষাপট (দালিলিক প্রমাণ)
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ছিল দেশি-বিদেশি শক্তির একটি সুপরিকল্পিত অভ্যুত্থান। এর অকাট্য দলিলসমূহ হলো:
১. অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র: লেঃ কর্নেল (অবঃ) এম এ হামিদ তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে সামরিক বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে একটি চক্র ক্ষমতা দখলের নীল নকশা তৈরি করেছিল।
২. আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ফ্যাক্টর: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং তৎকালীন বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে লরেন্স লিফশুলজ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত-সোভিয়েত বন্ধুত্বের কারণে এই হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল।
৩. বিচারিক দলিল: বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় (১৯৯৮)। এই রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যাতে সরাসরি সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য জড়িত ছিল। বাকশাল কোনো আইনি বা বিচারিক কারণ হতে পারে না।
৩. বিভ্রান্তি নিরসনে সাংবাদিকের বার্তা
অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থে বাকশালকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু একজন সাংবাদিক হিসেবে আমরা দলিলে বিশ্বাসী। বাকশাল গঠনের ফলে যে প্রশাসনিক সংস্কার শুরু হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হওয়ার আগেই ১৫ই আগস্ট ঘটে। সুতরাং, বাকশাল হত্যাকাণ্ডের কারণ নয়, বরং হত্যাকাণ্ডের ফলে যে রাষ্ট্রদর্শন ধ্বংস করা হয়েছিল, তার অন্যতম অংশ ছিল বাকশাল।